দেশজুড়ে চলছে তীব্র লোডশেডিং
দেশজুড়ে চলছে তীব্র লোডশেডিং। বিদ্যুতের আসা-যাওয়ায় গ্রাহকের ভোগান্তি এখন নিত্যদিনের ব্যাপার। গ্যাস-কয়লার সংকটে চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যুৎ দিতে হিমশিম খাচ্ছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকার তেলচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্র দিয়ে উৎপাদন বৃদ্ধির চেষ্টাও করছে। তবে এ সংকটজনক পরিস্থিতিতেও দেশের ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন বন্ধ আছে। জ্বালানিসংকট, মেয়াদ শেষ হওয়া ও যান্ত্রিক ত্রুটিই এর প্রধান কারণ। বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ও অন্তর্বর্তী সরকার সময়মতো মেয়াদোত্তীর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালুর ব্যবস্থা ও যান্ত্রিক ত্রুটির কাজগুলো সম্পন্ন না করায় এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগ এবং পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের (পিজিসিবি) তথ্যে এবং বাংলাদেশ প্রতিদিন-এর অনুসন্ধানে বিষয়টি জানা যায়। এ বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে সরকারি ২৩ আর বেসরকারি ১৪টি। জ্বালানিসংকটের কারণে বর্তমানে বন্ধ থাকা বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো পুনরায় চালুর চেষ্টা করা হচ্ছে বলে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (পিডিবি) চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বাংলাদেশ প্রতিদিনকে নিশ্চিত করেছেন। এ ক্ষেত্রে ২০ সেপ্টেম্বরের পর কেন্দ্রগুলো পুনরায় চালু হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেছেন।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ম. তামিম বলেন, ‘যান্ত্রিক ত্রুটি ও জ্বালানির অভাবে অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ আছে। সেগুলো ঠিক করতে নিশ্চয়ই কাজ চলছে। জ্বালানির অভাবে পায়রায় একটি ও রামপালে একটি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। জ্বালানি বিশেষ করে কয়লার অভাবটা ঠিক গ্রহণযোগ্য নয়। সরকারের উচিত কয়লার সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং এটা করা সম্ভব। কয়লার অভাবে কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র সম্পূর্ণ চালু করা যাচ্ছে না, এটা গ্রহণযোগ্য নয়।’
তিনি বলেন, ‘যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্রের চুক্তি এক্সপায়ার হয়ে গেছে সেগুলো মূলত তেলভিত্তিক কেন্দ্র। সরকার সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেলভিত্তিক কেন্দ্রগুলো চালু করবে। অনেকটি জ্বালানির অভাবে বন্ধ হয়ে আছে, টাকাপয়সা দেওয়া হয়নি প্রাইভেট সেক্টরকে। সেগুলো এখন কিছু টাকা পরিশোধ করে উৎপাদনে আনার চেষ্টা করছে সরকার।’
সূত্রে জানা গেছে, দেশে ১৩৩টি বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে। মূলত জ্বালানিসংকট, বেশ কিছু কেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হওয়া এবং যান্ত্রিক ত্রুটির কারণেই বর্তমানে ৩৭টি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ আছে। আবার জ্বালানিসংকটের কারণে চালু থাকা উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কেন্দ্রের উৎপাদন আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। বর্তমানে সব মিলিয়ে দেশে বিদ্যুতের ঘাটতি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫৫৭ মেগাওয়াটে। বৃহস্পতিবার বিকালে দেশে বিদ্যুতের চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ৩৪৫ মেগাওয়াট। বিপরীতে উৎপাদন হচ্ছিল ১২ হাজার ৭৮৮ মেগাওয়াট।
সরকারি-বেসরকারি কেন্দ্রগুলোর মধ্যে দেশের বাইরের আমদানীকৃত বিদ্যুৎ ছাড়া ১৩৩টি কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ১৯ হাজার ৫৩৭ মেগাওয়াটের বেশি। আর বর্তমানে বন্ধ থাকা ৩৭ কেন্দ্রের উৎপাদনক্ষমতা ৭ হাজার ২৬৯ মেগাওয়াট।
পিডিবি চেয়ারম্যান মো. রেজাউল করিম বলেন, ‘অনেক সময় আমরা জ্বালানি দিতে পারি না দেখে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকে। সম্প্রতি দেশে গ্যাসের বরাদ্দ কমে গেছে। এজন্য অনেক কেন্দ্র চালানো যাচ্ছে না। তেল দিয়ে বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর চেষ্টা করছি। কিন্তু তেল সঙ্গে সঙ্গে পাওয়া যায় না, এটি আমদানি করতে হয়। বিপিসিও এ মুহূর্তে তেল নিয়ে সংকটে আছে। কোম্পানিগুলোকেও অর্থ দেওয়া হয়েছে। এ তেল আমদানি করতেও ১৫-২০ দিন লাগে। আশা করা হচ্ছে বন্ধ অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র ২০ তারিখের পর চালু হবে। যে কেন্দ্রগুলোর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে তা নবায়নের বিষয়ে এখনো সিদ্ধান্ত হয়নি। যেগুলো চালু আছে সেগুলোর ওপরই গুরুত্ব দেওয়া হবে।’
বন্ধ যেসব বিদ্যুৎকেন্দ্র : পাওয়ার গ্রিড কোম্পানি বাংলাদেশের তথ্যে, ৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা ও আশপাশ এলাকায় ১৫টি সরকারি-বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ ছিল। এর মধ্যে ঘোড়াশাল রিপাওয়ার্ড সিসিপিপি ইউনিট-৩, ঘোড়াশাল রিপাওয়ার্ড সিসিপিপি ইউনিট-৪, ঘোড়াশাল টিপিপি ইউনিট-৫, ঘোড়াশাল ৩৬৫ মেগাওয়াট সিসিপিপি ইউনিট-৭ গ্যাসসংকটের কারণে এবং ঘোড়াশাল ১০৮ মেগাওয়াট পিপি (রিজেন্ট) গ্যাস সমস্যায় বন্ধ ছিল। গ্যাস সমস্যায় বন্ধ আছে হরিপুর জিটিপিপি বিদ্যুৎকেন্দ্র। হরিপুর ৩৬০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (এইচপিএল) এবং মেঘনাঘাট ৪৫০ মেগাওয়াট সিসিপিপি (এমপিএল) বিদ্যুৎকেন্দ্রের মেয়াদ শেষ হওয়ায় বন্ধ। মেঘনাঘাট সিসিপিপি (সামিট) বিদ্যুৎকেন্দ্র গ্যাস এবং সিদ্ধিরগঞ্জ ২১০ মেগাওয়াট টিপিপি সংস্কারের জন্য বন্ধ আছে। সিদ্ধিরগঞ্জ ৩৩৫ মেগাওয়াট সিসিপিপি গ্যাসসংকট এবং গাগনগর ১০২ মেগাওয়াট পিপি তেলসংকটে বন্ধ আছে। টঙ্গী ৮০ মেগাওয়াট জিটিপিপি সংস্কারের কারণে এবং মেঘনাঘাট ১০৪ মেগাওয়াট পিপি (ওপিসিএল) তেলসংকটে বন্ধ। মেঘনাঘাট সিসিপিপি (সামিট)-২-এরও উৎপাদন বন্ধ।